বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) থেকে বাংলাদেশ জুজুৎসু অ্যাসোসিয়েশন। মাঝে ফেডারেশন ও অ্যাসোসিয়েশন আরও ৫১টি। দেশে ক্রীড়া ফেডারেশন ও অ্যাসোসিয়েশনের তালিকাটা বেশ লম্বাই। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এখন দেশের সবচেয়ে ধনী ফেডারেশন। এরপরই ফুটবল।

বাকি ফেডারেশনগুলোর মধ্যে বেশিরভাগেরই বছর চলে নানা কষ্ট আর সংকটে। অর্থ সংকট, ভেন্যু সংকটের মধ্যেই চলে তাদের কার্যক্রম। ছোট এই ফেডারেশনগুলোর ‘নুন আনতে পান্তা ফুরোয়’ অবস্থা।

ছোট ছোট ফেডারেশনগুলো কিভাবে তাদের কার্যক্রম চালায় তা নিয়ে এই ধারাবাহিক প্রতিবেদন। আজকের খেলা থ্রো-বল।

থ্রো-বল কী? শিরোনাম দেখে হয়তো অনেকেই প্রথম বাক্যে এর উত্তর খুঁজবেন। এটি একটি খেলা। বাংলাদেশে এর প্রচলন শুরু বছর দশেক আগে।

খেলাটি দেখলে যে কেউ ভাবতে পারেন ভলিবল। আসলে ভলিবল, হ্যান্ডবল ও নিউকম্ব (মডিফাইড ভলিবল) খেলার মিশেলে হয়েছে থ্রো-বল।

১৯৩০ সালে অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডে এই খেলাটি শুরু হয়। চল্লিশের দশকে খেলাটি শুরু হয় ভারতে। দেশটির চেন্নাইয়ে প্রথম খেলাটি প্রচলন। ১৯৪০ সালে চেন্নাইয়ে মেয়েদের একটি টুর্নামেন্ট দিয়ে থ্রো-বল ভারতে যাত্রা করে। এখন এশিয়ান দেশগুলোতে বেশি প্রচলিত। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে থ্রো-বল। ভলিবল সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের হাত ধরে বাংলাদেশে থ্রো-বল খেলার যাত্রা ২০১২ সালে।

কিভাবে খেলে থ্রো-বল? জেনে নেওয়া যাক। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে এই খেলাটির অনেক মিল ভলিবলের সঙ্গে। কোর্টের আকার ভলিবলের চেয়ে কিঞ্চিত বড়। ভলিবল কোর্টের চেয়ে থ্রো-বলের কোর্ট লম্বায় বড় ৩০ ইঞ্চি এবং পাশে বড় ২০ ইঞ্চির বেশি। নেটের উচ্চতা ভলিবলের চেয়ে একটু কম।

ভলিবলে কোর্টে থাকেন ৬ জন, থ্রো-বলে ৭ জন। ভলিবল ৩ টাচের খেলা, থ্রোবল এক টাসের। অর্থাৎ বল প্রতিপক্ষের কাছ থেকে এল দুই হাতে ধরে এক হাতে নিক্ষেপ করা হয়। এখানেও বেশ মজার নিয়ম আছে-বল সামনাসামনি ধরা যাবে না, ডানে বা বামে ধরতে হবে। যে দিক থেকে বল ধরা হবে সেদিকের হাত দিয়ে নিক্ষেপ করতে হবে। উদাহরণ ডান দিকে ধরলে বল নিক্ষেপ করতে হবে ডান হাত দিয়ে। ধরার পর সর্বোচ্চ ৫ সেকেন্ড হাতে বল জমিয়ে রাখা যাবে। বল ধরার সময় পা মাটিতে রাখতে হবে। তবে নিক্ষেপের সময় লাফ দেওয়া যাবে।

সাবেক ভলিবল খেলোয়াড় আবুল কাশেম খান ও শামীম আল মামুনের নেতৃত্বে ৭ জন মিলে থ্রো-বল খেলার প্রচলন করেন দেশে। প্রথম যে কমিটি ছিল সেখানে আবুল কাশেম খান ছিলেন সভাপতি ও শামীম আল মামুন সাধারণ সম্পাদক। শামীম আল মামুন প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকে আছেন এই অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে। সভাপতি বদল হয়েছে তিন বার। বর্তমান সভাপতি নরসিংদী-৩ আসনের সংসদ সদস্য জহিরুল হক ভূঁইয়া মোহন।

২০১৮ সালে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ থ্রো-বল অ্যাসোসিয়েশনের স্বীকৃতি দেয়। তারপর থেকে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ থেকে অনুদান পাওয়া শুরু। প্রথম বছর জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ২ লাখ টাকা বরাদ্দের চিঠি দিয়েছিল অ্যাসোসিয়েশনকে। কিন্তু অ্যাসোসিয়েশন পেয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা।

২০২০ সালে বরাদ্দ পাওয়া ২ লাখ টাকার মধ্যে দুই কিস্তিতে সাড়ে ১২ হাজার টাকা করে ২৫ হাজার টাকা পেয়েছে থ্রো-বল। অথচ ২০১৮ সালের বরাদ্দের বাকি ৭৫ হাজার টাকা এখনো পায়নি অ্যাসোসিয়েশন।

দেশে অপ্রচলিত ও নতুন এই খেলাটির অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ভুগছে নানা সমস্যায়। সব কার্যক্রম মিলিয়ে বছরে অ্যাসোসিশেনের খরচ আছে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা। বিদেশে কোন টুর্নামেন্টে দল পাঠালে খরচ বেড়ে যায়। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ যে অনুদান দেয় তা দিয়ে কিছুই হয় না। বিদেশে দল পাঠালে ফেডারেশনই সে অর্থের ব্যবস্থা করে।

বাংলাদেশ থ্রোবল অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শামীম আল মামুন বললেন, ‘বিদেশে দল পাঠানোর সময় যাকে ম্যানেজার বানানো হয় তিনি একটা খরচ দেন। এ ছাড়া ফেডারেশনের কর্মকর্তাদের মধ্যে থেকে চাঁদা সংগ্রহ করে দলের খরচের ব্যবস্থা করা হয়।’

থ্রো-বল অ্যাসোসিয়েশনের কার্যক্রম চালানোর মতো কোন কার্যালয় নেই। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের স্বীকৃতি পাওয়ার আগ পর্যন্ত অ্যাসোসিয়েশন আজিমপুরে একটি রুম ভাড়া করেছিল। স্বীকৃতি পাওয়ার পর জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ কোথাও কার্যালয়ের ব্যবস্থা করবে, সে প্রত্যাশায় ভাড়া করা কক্ষটি ছেড়ে দেওয়া হয়।

কিন্তু জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ কোন কক্ষ বরাদ্দ না দেওয়ায় থ্রো-বল অ্যাসোসিয়েশনকে অফিসিয়ালি কার্যক্রম চালাতে হয় কর্মকর্তাদের বাসায়। সে কাজগুলো বেশি হয়ে থাকে সাধারণ সম্পাদকের বাসায়। শামীম আল মামুন জানালেন তার বাসায় প্রিন্টারসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আছে কাজ করার জন্য।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত অ্যাসোসিয়েশন আয়োজন করেছে তিনটি জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ (২০১৬, ২০১৭ ও ২০১৯ সালে)। এর বাইরে ২০১২ সালে সাতক্ষীরায় উন্মুক্ত টুর্নামেন্ট, ২০১৩ সালে খুলনার দৌলতপুরের ক্রিসেন্ট জুটমিল মাঠে উন্মুক্ত থ্রো-বল টুর্নামেন্ট, ২০১৬ সালে কক্সবাজারে বিচ থ্রো-বল এবং সর্বশেষ গত মার্চে পল্টনের শেখ রাসেল রোলার স্কেটিং কমপ্লেক্সে মুজিববর্ষ উপলক্ষ্যে স্বাধীনতা দিবস থ্রো-বল চ্যাম্পিয়নশিপ আয়োজন করে বাংলাদেশ থ্রো-বল অ্যাসোসিয়েশন।

থ্রো-বল চালুর বছরই ভারতের ছত্তিশগড়ে বাংলাদেশ মেয়েদের দল অংশ নিয়েছিল পেন্টাংগুলার থ্রো-বল টুর্নামেন্টে। বাংলাদেশ প্রথম অংশগ্রহণেই তৃতীয় হয়েছিল। ২০১৫ সালে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে পঞ্চম এশিয়ান থ্রো-বল চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিয়ে বাংলাদেশ দল তৃতীয় হয়েছিল পাকিস্তানকে হারিয়ে। একই বছর ভারতের ব্যাঙ্গালুরুতে অনুষ্ঠিত পেন্টাগুলার থ্রো-বল চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিয়েও তৃতীয় হয়েছিল বাংলাদেশ। ২০১৬ সালে কুয়ালালামপুরে এশিয়ান থ্রো-বল চ্যম্পিয়নশিপে অংশ নিয়ে ছেলেদের দল তেমন কিছু করতে পারেনি।

এই আন্তর্জাতিক ও ঘরোয়া প্রতিযোগিতা ছাড়াও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্রীড়া শিক্ষকদের নিয়ে ট্রেনিং ক্যাম্প করেছে অ্যাসোসিয়েশন। ঢাকা, ময়মনসিংহ, বাগেরহাট, চট্টগ্রাম, খুলনার দৌলতপুর, নরসিংদী ও যশোরের বিভিন্ন স্কুল কলেজে থ্রো-বল খেলা শিক্ষার ব্যবস্থা করেছে ফেডারেশন।

২০১২ সালে থ্রোবল শুরুর পর থেকে এই অ্যাসোসিয়েশনটি চলছে অ্যাডহক কমিটির মাধ্যমেই। মাঝে তিনবার সরকার মনোনীত সভাপতি পরিবর্তন হলেও সাধারণ সম্পাদক আছেন প্রতিষ্ঠাকালীন থেকে। তবে অ্যাসোসিয়েশনে নির্বাচন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানালেন সাধারণ সম্পাদক শামীম আল মামুন ‘নির্বাচনের জন্য আমরা গঠণতন্ত্র তৈরি করে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে জমা দিয়েছি। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ চাইলেই নির্বাচনের উদ্যোগ নিতে পারে।’

খেলার প্রচলন শুরু থেকে এ পর্যন্ত দেশে বেশ খেলোয়াড় তৈরি হয়েছে বলে জানালেন সাধারণ সম্পাদক, ‘ছেলে-মেয়ে মিলিয়ে ৫ থেকে ৬ শত খেলোয়াড় আছে থ্রো-বলে। জাতীয় দলে খেলার মতো খেলোয়াড় আছে ৪০-৫০ জন। বেশিরভাগই সার্ভিসেস সংস্থার। পুলিশের খেলোয়াড়ই বেশি আছে জাতীয় দলে।’

আরআই/আইএইচএস/