চট্টগ্রামে বাড়ছে করোনার প্রকোপ, জনসমাগম নিয়ন্ত্রণের তাগিদ

রমেন দাশ গুপ্ত, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

চট্টগ্রাম ব্যুরো: শীতের প্রকোপ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে চট্টগ্রামে করোনাভাইরাসের সংক্রমণও বাড়তে শুরু করেছে। সর্বশেষ গত ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্তের হার একদিনের ব্যবধানে বেড়েছে প্রায় ৬ শতাংশ। একদিনেই আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন ২৪২ জন। করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে স্বাস্থ্য বিভাগ আবারও বিনোদন কেন্দ্র, কমিউনিটি সেন্টারগুলো সাময়িক বন্ধ ঘোষণার পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি মানাতে ব্যাপকভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার তাগিদ দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জনের কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, রোববার (২২ নভেম্বর) সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামের আটটি ল্যাবে ১ হাজার ২৭০টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে নগরীর ২০০ জন এবং বিভিন্ন উপজেলার ৪২ জন বাসিন্দার শরীরে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। শনাক্তদের মধ্যে ১৬২ জন পুরুষ এবং ৮০ জন নারী। তবে করোনায় গত ২৪ ঘণ্টায় কারও মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি।

আগের দিন শনিবার আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হন ১৪৫ জন। আক্রান্তের হার ছিল সাড়ে ১৩ শতাংশ। মাত্র একদিনের ব্যবধানে সেই হার গিয়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশে। রোববার সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় এক লাফে সংক্রমণ প্রায় ২০ শতাংশ ছুঁয়েছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে করোনা সংক্রমণ ১০ শতাংশ থেকে দ্বিগুণ হয়েছে। বিজ্ঞাপন

চট্টগ্রামে এ পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ২৩ হাজার ৮৭০ জন। আক্রান্তের হার শহরে বেশি। শহরে মোট করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ১৭ হাজার ৮৫১ জন। চট্টগ্রামে এ পর্যন্ত ৩১৩ জন করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। এর মধ্যে শহরের ২১৯ জন।

জেলা সিভিল সার্জন সেখ ফজলে রাব্বি সারাবাংলাকে বলেন, ‘শীত মৌসুম শুরু হলে করোনার প্রকোপ বাড়বে এমন আশঙ্কা আমাদের ছিল। সেটাই আস্তে আস্তে সত্যি হচ্ছে। করোনার অতিমারী অর্থাৎ গত মে–জুন মাসে দিনে গড়ে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত শনাক্ত হতো। নভেম্বরের শুরুর দিকেও শনাক্তের হার ১০ শতাংশের নিচে ছিল। এখন তা ঊর্ধ্বমুখী।’ বিজ্ঞাপন

আক্রান্তের হার বেড়ে যাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘গরম এবং বৃষ্টির দিনে মানুষের জটলা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। আড্ডা দিলেও মানুষের মধ্যে দূরত্ব বজায় থাকে। কিন্তু শীতকালে পরস্পরের মধ্যে দূরত্ব রক্ষা হয় না, জটলাও দীর্ঘস্থায়ী হয়। আরেকটা বিষয় হচ্ছে- আমাদের দেশে প্রচলিত একটা রীতি হচ্ছে শীতকালেই বিয়েশাদি, সামাজিক অনুষ্ঠান, ওয়াজ মাহফিল, পূজাপার্বণ বেশি হয়। সেখানে লোকসমাগমও হয় বেশি। এবারও হচ্ছে। এছাড়া বিশ্বের অনেক দেশে যেখানে বছরের শুরুতে সংক্রমণের হার বেশি ছিল, সেসব দেশে তখন শীতকাল ছিল। সেই বিবেচনায় আমরাও ধরে নিয়েছিলাম, শীত এলে সংক্রমণ বাড়বে।’

এদিকে শনাক্তের পাশাপাশি হাসপাতালগুলোতেও রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। করোনায় আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামের প্রধান বিশেষায়িত চিকিৎসা কেন্দ্র চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে সোমবার (২৩ নভেম্বর) রোগী ভর্তি ছিল ৪৮ জন। এর মধ্যে সাতজন ছিলেন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ)। অথচ একমাস আগেও এই হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা ২০ জনের মধ্যে থাকতো বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। বিজ্ঞাপন

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. আব্দুর রব সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালে সপ্তাহখানেক ধরে রোগী বাড়তে শুরু করেছে। এর মধ্যে কেউ কেউ মারাত্মক জটিলতা নিয়েও ভর্তি হচ্ছেন। গত ১৫ দিনে চট্টগ্রামে করোনা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।’ বিজ্ঞাপন

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের সহকারী পরিচালক সাজ্জাদ চৌধুরী জানান, সোমবার হাসপাতালে করোনা আক্রান্ত রোগী ভর্তি আছেন ৩৫ জন। এছাড়া উপসর্গ নিয়ে ভর্তি আছেন ৬১ জন। গত ৩-৪ দিনে করোনা রোগী বাড়তে শুরু করেছে।

তবে সিভিল সার্জন জানিয়েছেন, আক্রান্তের চেয়ে হাসপাতালে আসা রোগীর সংখ্যা কম। জটিলতা বেশি না হলে লোকজন বাসায় চিকিৎসা নিয়েই সুস্থ হচ্ছেন। মৃত্যুর হারও কম। তবে এই পরিস্থিতি ধরে রাখা যাবে না বলেও মনে করছেন তিনি।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার জন্য মানুষের অসচেতনতাকে দায়ী করেছেন চট্টগ্রামের বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক হাসান শাহরিয়ার কবির। তিনি বলেন, ‘লোকজন স্বাস্থ্যবিধি একেবারেই মানছেন না। বিনোদন কেন্দ্র-পর্যটন স্পট, কমিউনিটি সেন্টার- সবখানেই ভিড়। এজন্য করোনার প্রকোপ বেড়েছে।’

সিভিল সার্জন সেখ ফজলে রাব্বী সারাবাংলাকে বলেন, ‘আজও (সোমবার) সিটি করপোরেশনে আমরা করোনা মোকাবিলায় করণীয় নিয়ে বৈঠক করেছি। সেখানে বলেছি যে, বিনোদন কেন্দ্র-পর্যটন স্পটগুলো আবারও সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হোক। কমিউনিটি সেন্টারগুলোতে অনুষ্ঠান আয়োজন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হোক। মোবাইল কোর্টের সংখ্যা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। পরিস্থিতির অবনতি যদি আমরা না চাই, তাহলে সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা যেকোনোভাবেই নিশ্চিত করতে হবে।’

এদিকে করোনার সংক্রমণ মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন প্রতিদিন নগরীর বিভিন্ন স্থানে মাস্ক পরিধান ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা নিশ্চিত করতে অভিযান চালাচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিদিনই নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে করোনা সচেতনতাবিষয়ক প্রচারণা চালাচ্ছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন।

সোমবার চসিকের কার্যালয়ে এ সংক্রান্ত এক বৈঠকে চসিক প্রশাসক চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. ওমর ফারুককে নগরীর পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত, শিশুপার্ক, চিড়িয়াখানা, মার্কেট-শপিংমল এবং কাঁচাবাজারে মাস্ক পরিধানের অভিযান জোরদারের তাগিদ দেন। বিয়েসহ সামাজিক অনুষ্ঠান নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান চসিক প্রশাসক।

সুজন বলেন, ‘চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করোনা চিকিৎসায় ৩০০ শয্যা আছে। জেনারেল হাসপাতালেও ৩০০ শয্যা আছে। তাদের আরও ১০০ শয্যার প্রস্তুতি আছে। করোনার প্রকোপ যদি বেশি বাড়ে, তাহলে সিটি করপোরেশনের মেমন হাসপাতালের দ্বিতীয় ইউনিটে আমরা করোনা চিকিৎসার ব্যবস্থা করব। কোনো প্রাইভেট হাসপাতাল-ক্লিনিক যদি করোনায় আক্রান্তদের চিকিৎসা দিতে অনীহা প্রকাশ করে তাদের ট্রেড লাইসেন্স বাতিল করে দেওয়া হবে।’

ছবি: শ্যামল নন্দী

সারাবাংলা/আরডি/পিটিএম

সর্বশেষ সংবাদ