ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৩ এপ্রিল ২০২৫, ১৯ চৈত্র ১৪৩১

মিয়ানমারের মতো ভূমিকম্প হলে বাংলাদেশের কী পরিণতি হতে পারে

জাতীয় ডেস্ক . ২৪ নিউজ
২০২৫ মার্চ ২৯ ২২:২৮:১৬
মিয়ানমারের মতো ভূমিকম্প হলে বাংলাদেশের কী পরিণতি হতে পারে

নিজস্ব প্রতিবেদক: 28 মার্চ মিয়ানমারের মান্দালয়ে 7.7 মাত্রার এক শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে, যার ফলে হাজারেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটে। ১০ কিলোমিটার গভীরতার এই ভূমিকম্প বাংলাদেশের ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলেও অনুভূত হয়েছে। প্রশ্ন হলো, যদি এমন শক্তিশালী ভূমিকম্প ঢাকার কাছাকাছি কোথাও আঘাত হানে, তবে তার পরিণতি কী হতে পারে? বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ ভূমিকম্পের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি অঞ্চলে অবস্থিত। ইন্ডিয়ান, ইউরেশিয়ান এবং বার্মিজ টেকটনিক প্লেটের সংযোগস্থলে বাংলাদেশ অবস্থান করছে, যা ভূমিকম্পের ঝুঁকি বাড়ায়। ইন্ডিয়ান প্লেটের উত্তর দিকে সরে যাওয়ার ফলে মধুপুর ও ডাউকি ফল্টে চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, এবং এর ফলে ৭ মাত্রা বা তারও বেশি শক্তিশালী ভূমিকম্পের আশঙ্কা বেড়েছে।

বুয়েটের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ইশরাত ইসলাম *টিবিএস*কে জানান, "বাংলাদেশ ভূমিকম্পের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, তবে এ ব্যাপারে কিছু বিচ্ছিন্ন কাজ হলেও কমিউনিটি এবং ভবন নির্মাণের তদারকি যথাযথভাবে হচ্ছে না। ভূমিকম্প হলে পরবর্তী করণীয় কী, সে বিষয়ে আমাদের কমিউনিটি সচেতন নয়। আমাদের ওপেন স্পেসের সংকট এত বেশি যে, ভূমিকম্প হলে আশ্রয় এবং উদ্ধার কাজের ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হবে।"

তিনি আরও বলেন, ঢাকার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে পুরান ঢাকা এবং বসুন্ধরা এলাকা। বিশেষভাবে পুরান ঢাকার অধিকাংশ ভবন একে অপরের সঙ্গে লাগোয়া এবং এসব ভবনের ভিত্তি দুর্বল। অনেক ভবন পুরনো, যা ভূমিকম্পের সময় বিপদের কারণ হতে পারে। বসুন্ধরা ও অন্যান্য নরম ভূমির এলাকায় ভূমিকম্পের ঝুঁকি বেশি, তাই ভবন নির্মাণে সঠিক বিল্ডিং কোড মেনে কাজ করতে হবে এবং রাজুক ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নজরদারি বাড়াতে হবে।

অধ্যাপক ইশরাত ইসলাম আরও বলেন, "ভূমিকম্প পরবর্তী ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের কমিউনিটি বেসড প্রস্তুতি গড়ে তোলার প্রয়োজন। মানুষ কোথায় আশ্রয় নেবে, কোথায় চিকিৎসা নেবে, কোন রাস্তা ব্যবহার করবে—এসব বিষয়ে আগে থেকেই প্রস্তুতি থাকা উচিত।" তিনি সরকারকে চারটি বিষয় গুরুত্বসহকারে নেয়ার জন্য অনুরোধ করেন:

1. বিল্ডিং কোড মেনে ভবন নির্মাণ।2. বর্তমান ভবনগুলোর যথাযথ মূল্যায়ন করা।3. ভূমিকম্পের পর উদ্ধার কার্যক্রমের জন্য পরিকল্পনা তৈরি করা।4. মাটির ধরনের ভিত্তিতে ভবন নির্মাণের ব্যবস্থা করা।

সম্প্রতি রাজুকের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, টাঙ্গাইলের মধুপুর ফল্টে 6.9 মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকার ৪০.২৮ থেকে ৬৫.৮৩ শতাংশ ভবন ধসে পড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সময়ভেদে প্রাণহানির সংখ্যা ব্যাপক হতে পারে: ভোরে হলে ২.১ থেকে ৩.১ লাখ, দুপুরে ২.৭ থেকে ৪ লাখ, এবং রাতে ৩.২ থেকে ৫ লাখ মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে।

রাজুকের আরেকটি গবেষণায় বলা হয়েছে, সিলেটে ৭.১ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকায় ৪০,৯৩৫ থেকে ৩ লাখ ১৪ হাজার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা মোট ভবনের ১.৯১ শতাংশ থেকে ১৪.৬৬ শতাংশের মধ্যে হতে পারে। এই ভবনগুলোর মধ্যে ৫ লাখ ১৪ হাজার কংক্রিটের তৈরি এবং ৪২টি ভবনকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে ভেঙে ফেলার সুপারিশ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, ঢাকা বিশ্বের ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর একটি, যেখানে অপরিকল্পিত ও দুর্বল ভবন এবং বস্তি রয়েছে, যা ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি অনেক গুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। তাছাড়া, বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল নরম ও জলাবদ্ধ পলি মাটির ওপর গড়ে উঠেছে, যা ভূমিকম্পে মাটি সহজেই নরম হয়ে ভবন ধ্বংসের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, জাপান বা ক্যালিফোর্নিয়ার মতো ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলের তুলনায় বাংলাদেশের জনসচেতনতা ও দুর্যোগ মোকাবিলা ব্যবস্থার মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে। ১৮৯৭ সালে ৮ মাত্রার গ্রেট ইন্ডিয়ান আর্থকেকের সময় তৎকালীন অবিভক্ত বাংলায় ১৫০০ জনেরও বেশি প্রাণ হারিয়েছিল। ১৯১৮ সালে শ্রীমঙ্গল ভূমিকম্পেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ রুবায়েত কোভিদ *টিবিএস*কে বলেন, "আমরা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থান করছি এবং দেশের বাইরের ভূমিকম্পও ঢাকায় প্রভাব ফেলতে পারে। ভবনগুলো ভূমিকম্প প্রতিরোধী হওয়া উচিত এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা আগে থেকেই তৈরি থাকতে হবে।"

তিনি আরও বলেন, "28 মার্চের ভূমিকম্পটি সম্পর্কে আমরা আগেই সতর্ক করেছিলাম, কারণ ওই অঞ্চলে সিসমিক গ্যাপ তৈরি হয়েছিল, যার কারণে দীর্ঘদিন ভূমিকম্প হয়নি। আশপাশের টেকটনিক প্লেট, বিশেষ করে ইউরোশিয়ান প্লেট, আরও ভূমিকম্প তৈরি করতে পারে, যার প্রভাব ভবিষ্যতে বাংলাদেশেও পড়তে পারে।"

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাংলাদেশে ভূমিকম্পের প্রস্তুতি আরও জোরদার করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে কোনো বিপর্যয়ের সময় ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব হয়।

—সোহাগ/

ট্যাগ: ভুমিকম্প

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ